টিকটক যুগে মনোযোগ

রাত এগারোটায় শুয়ে ভাবলাম, "পাঁচ মিনিট ভিডিও দেখে ঘুমাব।" তারপর একটা রান্নার ভিডিও, একটা বিড়ালের ভিডিও, কেউ একজন পুরনো ফার্নিচার নতুন করছে, একটা কৌতুক, আরেকটা বিড়াল। হঠাৎ ঘড়িতে দেখি রাত দেড়টা।
এটা আপনার দুর্বলতা না। এটা খুব দক্ষ প্রকৌশলের ফল।
কেন থামা এত কঠিন

কম পরিশ্রম: প্রতিটা ভিডিও এত ছোট যে "আরেকটা দেখি" বলা সহজ।
অপ্রত্যাশিত পুরস্কার: কোনটা মজার হবে, কোনটা বিরক্তিকর, জানা নেই। এই অনিশ্চয়তা মস্তিষ্ককে আরও খুঁজতে উৎসাহিত করে, অনেকটা জুয়ার যন্ত্রের মতো।
অ্যালগরিদম আপনাকে শেখে: কোন ভিডিওতে থেমেছেন, কতক্ষণ দেখেছেন, আবার দেখেছেন কি না, সব মনে রেখে পরের ভিডিও বাছাই করে। কয়েক দিনের মধ্যেই সে জানে আপনাকে কী ধরে রাখে।
কোনো স্বাভাবিক থামার জায়গা নেই: বইয়ের অধ্যায় শেষ হয়, সিনেমা শেষ হয়, কিন্তু ফিড কখনো শেষ হয় না।

মনোযোগের ওপর প্রভাব নিয়ে কী জানা যায়
গবেষকরা ছোট ভিডিও আর মনোযোগের সম্পর্ক নিয়ে এখনো গবেষণা করছেন, আর সব ফলাফল একমুখী না। তবে অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতায় যা বলেন: লম্বা লেখা পড়তে ধৈর্য কমে যাওয়া, একটা কাজে বেশিক্ষণ মন না বসা, ঘুম দেরিতে আসা। বিশেষ করে রাতে স্ক্রিনের ব্যবহার ঘুমের মান কমাতে পারে, যা পরের দিনের মনোযোগ আর মেজাজে প্রভাব ফেলে।
ছোট ভিডিও খারাপ না
রান্না শেখা, ভাষা শেখা, দ্রুত খবর, হাসির মুহূর্ত, অনেক ছোট নির্মাতার আয়ের উৎস। সমস্যা ভিডিওতে না; সমস্যা হলো যখন আমরা নিয়ন্ত্রণ হারাই আর সময়টা আমাদের অজান্তে চলে যায়।
মনোযোগ ফিরে পাওয়ার উপায়
১. ঘর্ষণ যোগ করুন। অ্যাপটা হোম স্ক্রিন থেকে সরিয়ে একটা ফোল্ডারের ভেতরে রাখুন। প্রতিবার খুলতে দুই ধাপ বেশি লাগলে অভ্যাসবশত খোলা কমে।
২. সময়সীমা ঠিক করুন। ফোনের স্ক্রিন টাইম বা ডিজিটাল ওয়েলবিয়িং সেটিংসে অ্যাপের দৈনিক সীমা দিন।
৩. বিছানায় ফোন না। রাতে ফোন চার্জে দিন বিছানা থেকে দূরে। পুরনো অ্যালার্ম ঘড়ি কিনুন। এই এক পরিবর্তনই অনেকের ঘুম বদলে দিয়েছে।
৪. ফিড প্রশিক্ষণ দিন। যা দেখতে চান না, সেখানে "আগ্রহী নই" চাপুন। যা শিখতে চান, সেটা খুঁজে দেখুন। অ্যালগরিদম আপনার আচরণ থেকে শেখে; শেখানোর দায়িত্ব আপনার হাতেও।
৫. বিকল্প রাখুন। একঘেয়েমির মুহূর্তে (লাইনে দাঁড়িয়ে, যানজটে) ফোনের বদলে একটা বই, পডকাস্ট, বা শুধু চারপাশ দেখা।
৬. মনোযোগের ব্যায়াম। প্রতিদিন অল্প সময় একটা লম্বা লেখা পড়ুন, একটা পুরো অ্যালবাম শুনুন, বা একটা কাজ বাধাহীনভাবে করুন। মনোযোগ পেশির মতো, চর্চায় বাড়ে।
বাবা-মায়েদের জন্য
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এটা আরও জরুরি। নিষেধের চেয়ে আলোচনা বেশি কাজ করে: কেন সময় সীমিত রাখা দরকার, কীভাবে অ্যালগরিদম কাজ করে। আর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো বাবা-মায়ের নিজের উদাহরণ।
শেষ কথা
আমাদের মনোযোগ এখন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটা; অনেক কোম্পানি এর জন্য প্রতিযোগিতা করছে। নিজের মনোযোগ কোথায় খরচ করবেন, সেটা সচেতনভাবে ঠিক করুন। পনেরো সেকেন্ডের ভিডিও দেখুন, উপভোগ করুন, কিন্তু রাত দেড়টায় ঘড়ি দেখে অবাক হওয়ার আগে নিজেই থামুন।