ভুয়া খবর আর হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি

পরিবারের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সকাল সাতটায় একটা বার্তা: "জরুরি! আগামীকাল থেকে অমুক কাজ করলে জরিমানা। সবাইকে জানান। ফরোয়ার্ড করুন।" সাথে একটা অস্পষ্ট ছবি, কোনো উৎস নেই। দুপুরের মধ্যে বার্তাটা দশটা গ্রুপে পৌঁছে গেছে। সন্ধ্যায় জানা গেল পুরোটাই ভুয়া।
এর নাম মজা করে দেওয়া হয়েছে "হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি": যেখানে ডিগ্রি ছাড়াই সবাই বিশেষজ্ঞ, আর পাঠ্যক্রম হলো ফরোয়ার্ড করা বার্তা।
কেন ভুয়া খবর এত দ্রুত ছড়ায়
আবেগ: যে খবর রাগ, ভয় বা বিস্ময় জাগায়, মানুষ সেটা বেশি শেয়ার করে। ভুয়া খবর প্রায়ই ঠিক এই আবেগগুলো লক্ষ্য করে বানানো হয়।
বিশ্বস্ত মানুষের কাছ থেকে আসে: অপরিচিত ওয়েবসাইট থেকে খবর পেলে সন্দেহ হয়। কিন্তু মামা, খালা বা অফিসের বড় ভাই পাঠালে আমরা বিশ্বাস করি।
আগের বিশ্বাস নিশ্চিত করে: যা আমরা আগে থেকেই বিশ্বাস করি, তার পক্ষের খবর যাচাই না করেই মেনে নিই।
ভালো উদ্দেশ্য: বেশিরভাগ মানুষ সাহায্য করার জন্য ফরোয়ার্ড করেন: "যদি সত্যি হয়, সবাই সতর্ক থাকুক।"
সাধারণ ধরন
- স্বাস্থ্য বিষয়ক অলৌকিক চিকিৎসা: "এই পাতা খেলে ক্যান্সার সেরে যায়।" বিপজ্জনক, কারণ মানুষ আসল চিকিৎসা দেরি করে।
- পুরনো ছবি, নতুন গল্প: অন্য দেশের বা দশ বছর আগের ছবি দিয়ে আজকের ঘটনা বলে চালানো।
- নকল সরকারি ঘোষণা: লোগো কপি করে বানানো "বিজ্ঞপ্তি"।
- "ফ্রি" অফার: "এই লিংকে ক্লিক করলে ১০ জিবি ফ্রি ডেটা।" আসলে প্রতারণা বা তথ্য চুরি।
- AI দিয়ে বানানো ছবি ও কণ্ঠ: দিন দিন বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে।
ফরোয়ার্ড করার আগে পাঁচ সেকেন্ড

উৎস কে? "শুনেছি", "এক ডাক্তার বলেছেন", "সূত্র: বিশ্বস্ত" — এগুলো উৎস না।
তারিখ কবের? অনেক "জরুরি" বার্তা কয়েক বছর পুরনো।
নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে আছে? সত্যিকারের বড় খবর একাধিক প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে আসে।
ছবি যাচাই করুন: রিভার্স ইমেজ সার্চ (ছবি দিয়ে গুগলে খোঁজা) করলে প্রায়ই ছবির আসল উৎস আর তারিখ পাওয়া যায়।
আবেগ খেয়াল করুন: খবরটা পড়ে খুব রাগ বা ভয় লাগছে? তাহলে আরও বেশি সতর্ক হোন।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ফ্যাক্ট-চেকিং উদ্যোগ নিয়মিত ভাইরাল খবর যাচাই করে প্রকাশ করে। সন্দেহজনক কিছু পেলে সেখানে খুঁজে দেখুন।
পরিবারের গ্রুপে কীভাবে বলবেন
বড়দের সরাসরি "ভুল" বললে অনেক সময় তারা অপমানিত বোধ করেন। নরমভাবে বলুন:
"চাচা, এটা নিয়ে একটু খুঁজে দেখলাম, এই লিংকে দেখাচ্ছে খবরটা পুরনো। আপনি সবসময় আমাদের সতর্ক রাখেন, তাই জানালাম।"
সম্মান রেখে তথ্য দিলে মানুষ শুনতে বেশি রাজি থাকেন।
শেষ কথা
ভুয়া খবরের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র কোনো অ্যাপ বা আইন না; সাধারণ মানুষের একটু সন্দেহ আর একটু ধৈর্য। প্রতিটা না-করা ফরোয়ার্ড একটা ভুয়া খবরের যাত্রা থামিয়ে দেয়। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে সেরা ছাত্র সে, যে সবচেয়ে কম ফরোয়ার্ড করে।