ই-বর্জ্য: আপনার পুরনো ফোন কোথায় যায়?

একবার ড্রয়ার গোছাতে গিয়ে পেলাম তিনটা পুরনো ফোন, দুটো নষ্ট হেডফোন, একগাদা চার্জার আর একটা ব্যাটারি যেটা একটু ফুলে গেছে। প্রায় প্রতিটা বাসায় এমন একটা "ইলেকট্রনিক কবরস্থান" আছে। প্রশ্ন হলো, এগুলো শেষ পর্যন্ত কোথায় যায়?
ই-বর্জ্য কী
নষ্ট বা পুরনো যেকোনো ইলেকট্রনিক জিনিস: মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজ, ব্যাটারি, চার্জার, এমনকি ইলেকট্রিক খেলনা। বিশ্বজুড়ে ই-বর্জ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, আর এর বড় অংশ সঠিকভাবে রিসাইকেল হয় না।

ভেতরে কী আছে
মূল্যবান জিনিস: সোনা, রুপা, তামা, আর কিছু বিরল ধাতু। সঠিকভাবে রিসাইকেল করলে এগুলো আবার ব্যবহার করা যায়।
বিপজ্জনক জিনিস: সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়ামের মতো বিষাক্ত উপাদান, আর লিথিয়াম ব্যাটারি যা ভুলভাবে রাখলে আগুন ধরতে পারে।
অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিংয়ের বিপদ
আমাদের দেশে ই-বর্জ্যের বড় অংশ যায় অনানুষ্ঠানিক ভাঙাড়ির দোকানে। সেখানে অনেক সময় খালি হাতে, কোনো সুরক্ষা ছাড়া, তার পুড়িয়ে তামা বের করা হয়, অ্যাসিড দিয়ে ধাতু আলাদা করা হয়। এতে:
- শ্রমিকদের, যাদের মধ্যে শিশুরাও থাকতে পারে, স্বাস্থ্যঝুঁকি
- বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে
- রাসায়নিক মাটি আর পানিতে মিশে যাওয়া
অর্থাৎ যে জিনিস আমাদের জীবন সহজ করেছিল, তার শেষ যাত্রা অন্য কারো জীবন কঠিন করে দিতে পারে।
ফুলে যাওয়া ব্যাটারি: সাবধান
ফোন বা ল্যাপটপের ব্যাটারি ফুলে গেলে সেটা চার্জ করবেন না, চাপ দেবেন না, ছিদ্র করবেন না। আগুন ধরার ঝুঁকি আছে। ঠান্ডা, আগুন থেকে দূরে, ধাতব জিনিস থেকে আলাদা করে রাখুন, আর সার্ভিস সেন্টারে বা যথাযথ সংগ্রহ কেন্দ্রে দিন। সাধারণ ময়লার ঝুড়িতে ফেলবেন না; ময়লার গাড়িতে বা ডাম্পিং স্টেশনে আগুনের কারণ হতে পারে।
আমরা কী করতে পারি
১. বেশিদিন ব্যবহার করুন। সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ফোন হলো যেটা আপনার হাতে আছে। একটা ব্যাটারি বদল বা স্ক্রিন মেরামত অনেক সময় নতুন ফোনের চেয়ে অনেক সস্তা আর ভালো সিদ্ধান্ত।
২. মেরামত করুন। আমাদের দেশে দক্ষ মেরামতকারীর অভাব নেই। মেরামতের সংস্কৃতি আসলে টেকসই উন্নয়নের অংশ।
৩. দিয়ে দিন বা বিক্রি করুন। চলে এমন পুরনো ফোন পরিবারের কাউকে, কোনো শিক্ষার্থীকে, বা বিক্রি করে দিন।
৪. তথ্য মুছে ফেলুন। দেওয়া, বিক্রি বা ফেলার আগে ফোন ফ্যাক্টরি রিসেট করুন, অ্যাকাউন্ট থেকে লগআউট করুন, মেমোরি কার্ড আর সিম খুলে নিন।
৫. সঠিক জায়গায় দিন। কিছু ব্র্যান্ড আর প্রতিষ্ঠান পুরনো ইলেকট্রনিক্স ফেরত নেয় বা রিসাইক্লিং কর্মসূচি চালায়। খুঁজে দেখুন আপনার এলাকায় কী আছে।
৬. দরকার ছাড়া নতুন কিনবেন না। প্রতি বছর নতুন মডেল আসে, কিন্তু প্রতি বছর নতুন ফোন দরকার হয় না।
নীতির প্রশ্ন
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদকদের দায়িত্ব (কোম্পানি তাদের পণ্যের শেষ জীবনের দায় নেবে), নিরাপদ রিসাইক্লিং কেন্দ্র, আর অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা, এসব বিষয়ে বিভিন্ন দেশে নিয়ম তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশেও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিধিমালা রয়েছে; এর কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
শেষ কথা
প্রযুক্তি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে, কিন্তু প্রতিটা ডিভাইসের একটা জীবনচক্র আছে: খনি থেকে কারখানা, আমাদের হাত, তারপর কোথায়? আজ ড্রয়ারটা একবার খুলুন। চলে এমন ফোন কারো কাজে লাগতে পারে, আর ফুলে যাওয়া ব্যাটারিটা সরিয়ে ফেলা আপনার পরিবারের নিরাপত্তার জন্যও জরুরি।