প্রবাসে বাঙালি খাবার খোঁজা

প্রবাসে আসার আগে কেউ বলেনি যে সবচেয়ে বেশি মিস করব খাবার। পরিবার, বন্ধু, দেশের শব্দ, গন্ধ, সবকিছুই মিস করি। কিন্তু প্রতিদিন তিনবার মনে করিয়ে দেয় খাবার।

অভিযান ১: মুদি দোকান
বড় শহরে দক্ষিণ এশীয় দোকান থাকে, যেখানে ঢুকলেই মশলার গন্ধে মনে হয় কারওয়ান বাজারে চলে এসেছি। ছোট শহরে সেটা পাওয়া কঠিন। সুপারমার্কেটের "আন্তর্জাতিক খাবার" তাকে খুঁজে পাওয়া যায় এক প্যাকেট বাসমতি চাল, এক বোতল "কারি পাউডার" (যেটা কোনো বাঙালি রান্নায় ব্যবহার হয় না), আর কোনো এক অজানা কোম্পানির "ইন্ডিয়ান সস"।
অভিযান ২: ইলিশ
ইলিশ পাওয়া মানে একটা ছোটখাটো উৎসব। অনেক সময় হিমায়িত ইলিশ পাওয়া যায় বড় শহরের দোকানে, দেশের দামের কয়েক গুণে। কেউ একজন বড় শহর থেকে আনলে খবর ছড়িয়ে পড়ে কমিউনিটিতে, আর সবাই ভাগ করে নেন। প্রবাসে ইলিশ শুধু মাছ না, এটা আবেগ।
অভিযান ৩: মায়ের রেসিপি
প্রথম যেদিন নিজে মুরগির ঝোল রান্না করলাম, মাকে ভিডিও কল করেছিলাম। কথোপকথনটা ছিল এরকম:
— মা, লবণ কতটুকু দেব? — আন্দাজমতো। — কত চামচ? — আন্দাজমতো দে, বুঝবি। — হলুদ? — একটু। — একটু মানে কত? — যতটুকু লাগে।
বাঙালি মায়েদের রেসিপিতে কোনো পরিমাপ নেই, আছে শুধু অভিজ্ঞতা। একজন ডেটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে বলতে পারি, মায়েরা আসলে একটা নিখুঁত মডেল, যার প্রশিক্ষণ ডেটা হলো কয়েক দশকের রান্না, কিন্তু যার প্যারামিটার কেউ কখনো লিখে রাখেনি।
উপকরণের বিকল্প
প্রবাসে অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়:
- সরিষার তেল না পেলে: অন্য তেল, শেষে একটু সরিষা বাটা।
- পাঁচফোড়ন: নিজে বানিয়ে নিন (মেথি, মৌরি, কালোজিরা, সরিষা, জিরা)।
- কাঁচামরিচ: অনেক জায়গায় বিভিন্ন জাতের মরিচ পাওয়া যায়, ঝাল একটু আলাদা।
- দেশি মাছ: স্থানীয় মাছ দিয়ে দেশি স্টাইলে রান্না। নিউফাউন্ডল্যান্ডের কড মাছ দিয়ে ভুনা খারাপ হয় না!
স্থানীয় খাবারের সাথে বন্ধুত্ব
প্রথমে শুধু দেশি খাবার খুঁজতাম। ধীরে ধীরে স্থানীয় খাবারও চেখে দেখলাম। নিউফাউন্ডল্যান্ডের ফিশ অ্যান্ড চিপস, স্থানীয় বেরি দিয়ে বানানো জ্যাম, আর পুটিন (ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, পনির আর গ্রেভি, যা কানাডার এক বিশেষ আবিষ্কার)। এখন বাসায় দুটোই চলে: শুক্রবার খিচুড়ি, শনিবার স্থানীয় কিছু।
খাবার দিয়ে সংযোগ
প্রবাসে বাঙালি খাবার একটা সেতু। স্থানীয় সহকর্মীদের বিরিয়ানি খাওয়ালে তারা এমন প্রশংসা করেন যে লজ্জা পেতে হয়। অন্য দেশের অভিবাসী বন্ধুদের সাথে খাবার বিনিময় হয়: তাদের ডাম্পলিং, আমাদের পিঠা। আর বাঙালি কমিউনিটির দাওয়াতে সবাই যখন নিজের সেরা রান্নাটা নিয়ে আসেন, তখন মনে হয় দেশ খুব একটা দূরে না।
শেষ কথা
প্রবাসে রান্না শেখা অনেকের কাছে প্রয়োজন থেকে শুরু হয়, তারপর সেটা হয়ে যায় দেশের সাথে সংযোগের একটা উপায়। প্রতিবার ফোড়নের গন্ধ রান্নাঘরে ছড়ালে কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয় মায়ের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছি। লবণটা অবশ্য এখনো আন্দাজমতোই দিই। মা ঠিকই বলেছিলেন, বুঝতে পারি।