প্রবাসের ঈদ

দেশে ঈদ শুরু হতো আগের রাতে। চাঁদ দেখার উত্তেজনা, টিভিতে "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে" গান, মেহেদির গন্ধ, শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সেমাই আর পোলাওয়ের ঘ্রাণ। সকালে নতুন জামা, ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, সালামি, আর সারাদিন আত্মীয়দের বাড়ি ঘোরা।
প্রবাসের প্রথম ঈদে আমার অ্যালার্ম বেজেছিল ভোর ছয়টায়, কারণ নামাজ শেষ করে নয়টায় অফিসে মিটিং ছিল।
ঈদের দিন, প্রবাস সংস্করণ

কানাডায় ঈদ সরকারি ছুটি না। অনেকে ছুটি নেন, অনেকে পারেন না। শীতকালে ঈদ হলে নামাজের জন্য কমিউনিটি সেন্টার বা স্কুলের জিমনেশিয়াম ভাড়া নেওয়া হয়, কারণ বাইরে মাইনাস দশ ডিগ্রি। ভারী জ্যাকেটের নিচে পাঞ্জাবি, আর বুটের ভেতরে ঈদের নতুন মোজা।
নামাজে এসে দেখা যায় পৃথিবীর নানা দেশের মানুষ: সোমালিয়া, সিরিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ। ভাষা আলাদা, পোশাক আলাদা, কিন্তু "ঈদ মুবারক" সবার মুখে একই।
ভিডিও কলে কোলাকুলি
সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত হলো দেশে ফোন করা। সময়ের পার্থক্যের কারণে দেশে হয়তো ঈদের দিন প্রায় শেষ, সবাই ক্লান্ত, আত্মীয়রা ঘরভর্তি। স্ক্রিনের এপাশ থেকে সবাইকে সালাম দেওয়া, মা জিজ্ঞেস করেন "সেমাই রান্না করেছিস?", ছোট ভাগনে ক্যামেরায় তার সালামির টাকা দেখায়। কল শেষে একটা অদ্ভুত নীরবতা নামে।
সেমাই অভিযান
প্রথম ঈদে নিজে সেমাই রান্না করার চেষ্টা করেছিলাম। দেশি দোকান থেকে কেনা সেমাই, স্থানীয় দুধ, আর মায়ের ভিডিও কলের নির্দেশনা। ফলাফল খাওয়ার মতো হয়েছিল, কিন্তু মায়ের মতো না। মা বললেন, "চিনি বেশি দিসস।" আমি বললাম, "তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ না।" মা বললেন, "মায়েরা বুঝে।"
কমিউনিটি: প্রবাসের পরিবার
প্রবাসে ঈদের আসল আনন্দ আসে সন্ধ্যায়। বাংলাদেশি কমিউনিটির কারো বাসায় বা কমিউনিটি হলে দাওয়াত। সবাই নিজের সেরা রান্নাটা নিয়ে আসেন: কারো বিরিয়ানি, কারো রোস্ট, কারো জর্দা, কারো ফিরনি। বাচ্চারা ছোটাছুটি করে, বড়রা দেশের রাজনীতি নিয়ে তর্ক করেন, আর কেউ একজন পুরনো দিনের গান ধরেন।
ছোট শহরে বাঙালি পরিবার হাতে গোনা, তাই সবাই সবাইকে চেনেন। নতুন কেউ এলে তাকে দাওয়াত না দেওয়া প্রায় অপরাধ। আমার প্রথম ঈদের সন্ধ্যায় এমন এক পরিবার ডেকেছিলেন, যাদের সাথে মাত্র একবার দেখা হয়েছিল। সেই সন্ধ্যায় প্রথম মনে হয়েছিল, দেশ থেকে দূরে থেকেও একটা পরিবার পাওয়া যায়।
স্থানীয় বন্ধুদের সাথে
অফিসের সহকর্মীরা অনেকে জানতে চান ঈদ কী, কেন, কীভাবে পালন করি। একবার অফিসে মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম, সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে খেলেন আর প্রশ্ন করলেন। ধীরে ধীরে কেউ কেউ ঈদের দিন নিজেরাই এসে বলেন, "Eid Mubarak!" উচ্চারণ একটু অন্যরকম, কিন্তু আন্তরিকতা পুরোটা।
বাচ্চাদের জন্য ঈদ
প্রবাসে বড় হওয়া বাচ্চাদের কাছে ঈদ যেন স্মরণীয় হয়, সেজন্য অনেক পরিবার বিশেষ চেষ্টা করেন: নতুন জামা, ঘর সাজানো, সালামি, আর স্কুলে ছুটির আবেদন। যাতে তারা বড় হয়ে মনে রাখে ঈদ মানে আনন্দ, পরিবার আর সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া।
শেষ কথা
প্রবাসের ঈদ দেশের ঈদের মতো না, হবেও না। কিছু শূন্যতা থেকেই যায়। কিন্তু একটা নতুন রকম ঈদ তৈরি হয়: জিমনেশিয়ামে নানা দেশের মানুষের সাথে নামাজ, স্ক্রিনের ওপাশে মায়ের হাসি, আর সন্ধ্যায় প্রবাসী পরিবারের সাথে একটা লম্বা টেবিল ভর্তি খাবার। চিনি একটু বেশি হলেও, সেমাইটা মিষ্টিই লাগে।