ভোরে ওঠার চেষ্টা: একটি ব্যর্থ পরীক্ষা (এবং যা শিখলাম)

ইন্টারনেটে একটা জনপ্রিয় ধারণা আছে: সফল মানুষরা সবাই ভোর পাঁচটায় ওঠেন। ঠান্ডা পানিতে গোসল, ধ্যান, জার্নাল লেখা, ব্যায়াম, আর সূর্য ওঠার আগেই অর্ধেক দিনের কাজ শেষ। ভিডিওগুলো দেখে মনে হলো, আমার জীবনে শুধু এটারই অভাব।
তাই এক সোমবার অ্যালার্ম দিলাম ভোর পাঁচটায়।

সোমবার
পাঁচটায় উঠলাম! জানালার বাইরে অন্ধকার, পুরো শহর ঘুমিয়ে। চা বানালাম, একটু পড়লাম, নিজেকে অসাধারণ মনে হলো। সকাল দশটায় অফিসের মিটিংয়ে প্রথম হাই তুললাম।
মঙ্গলবার
পাঁচটা পনেরো। মোটামুটি সফল। দুপুরে খাওয়ার পর কিবোর্ডের ওপর প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
বুধবার
সাড়ে পাঁচটা। অ্যালার্ম দুবার বন্ধ করেছি। চা খেতে খেতে বুঝলাম, আগের রাতে সাড়ে বারোটায় ঘুমিয়েছিলাম, অর্থাৎ পাঁচ ঘণ্টার ঘুম। সফলতা নাকি আত্মপ্রবঞ্চনা?
বৃহস্পতিবার থেকে
অ্যালার্ম বাজল, বন্ধ করলাম, আর পরের যা মনে আছে তা হলো সাতটা পনেরো। শনিবার সরাসরি নয়টা। বিপ্লব শেষ।
যা আসলে শিখলাম
১. আগে ঘুমানো ছাড়া আগে ওঠা মানে কম ঘুমানো। ভোরে ওঠার আসল রহস্য ভোরে ওঠা না, রাতে আগে ঘুমানো। আমি রাতের অভ্যাস না বদলে শুধু সকালের অ্যালার্ম বদলেছিলাম। এটা ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তন না, ঘুম কমানো।
২. বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত এটাই সুপারিশ করেন। কম ঘুমে মনোযোগ, মেজাজ, রোগ প্রতিরোধ, সবকিছুতে প্রভাব পড়ে। পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়ে "উৎপাদনশীল" হওয়ার চেষ্টা আসলে পরের দিনের কাজ থেকে ধার নেওয়া।
৩. সবার শরীর এক রকম না। কিছু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সকালের মানুষ, কেউ রাতের। একে বলে ক্রোনোটাইপ। নিজের প্রকৃতির বিরুদ্ধে জোর করার চেয়ে নিজের সেরা সময় চিনে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কাজ রাখা অনেক বেশি কার্যকর।
৪. সফল মানুষদের গল্পে বাছাই আছে। আমরা শুনি সেই প্রধান নির্বাহীদের কথা যারা পাঁচটায় ওঠেন। শুনি না সেই অসংখ্য সফল মানুষের কথা যারা আটটায় ওঠেন, বা যারা পাঁচটায় উঠে সারাদিন ক্লান্ত থাকেন।
৫. নিয়মিততা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো আর ওঠা, ছুটির দিনেও কাছাকাছি সময়ে, এটা ঘুমের মান অনেক বাড়ায়, ঠিক কয়টায় উঠছেন তার চেয়ে বেশি।
যা এখন করি
- রাতে ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে ফোন চার্জে, বিছানা থেকে দূরে।
- প্রতিদিন মোটামুটি একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া।
- সকালে উঠে দিনের আলো দেখা (জানালা খুলে দেওয়া বা একটু হাঁটা)।
- বিকেলের পর চা-কফি কম।
- সকালের প্রথম এক ঘণ্টা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য রাখা, সেটা যখনই শুরু হোক।
ফলাফল? এখন সাধারণত সাড়ে ছয়টায় উঠি, আগের চেয়ে অনেক কম ক্লান্ত লাগে, আর অ্যালার্মের সাথে প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় না।
শেষ কথা
ভোর পাঁচটায় ওঠার পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল, কিন্তু শিক্ষাটা ছিল মূল্যবান। উৎপাদনশীলতার রহস্য ঘুম কমানো না, ঘুমকে সম্মান করা। আর যারা সত্যিই পাঁচটায় উঠে সুখী, তাদের প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা। আমি শুধু তাদের একজন না, আর সেটা মেনে নেওয়াতেই একধরনের শান্তি আছে।