এমএলএম: পিরামিডের চূড়ায় কেউ পৌঁছায় না

হঠাৎ এক পুরনো বন্ধুর ফোন। দীর্ঘ শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর আসল কথা: "দোস্ত, একটা দারুণ ব্যবসায়িক সুযোগ আছে। তোর কোনো চাকরির টেনশন থাকবে না। শুধু তিনজনকে যুক্ত করবি, তারা আরও তিনজনকে করবে, আর তুই সবার কাছ থেকে কমিশন পাবি।"
শুনতে চমৎকার। একটু গণিত করা যাক।
তিনের গুণফল
ধরুন প্রত্যেকে তিনজন করে যুক্ত করেন।

- প্রথম ধাপে ৩ জন
- পঞ্চম ধাপে মোট ৩৬৩ জন
- দশম ধাপে প্রায় ৮৯ হাজার
- পনেরোতম ধাপে মোট দুই কোটির বেশি
শুধু ওই ধাপের সংখ্যা ধরলে আঠারোতম ধাপেই সংখ্যাটা বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছাড়িয়ে যায়, আর একুশতম ধাপে পুরো পৃথিবীর জনসংখ্যা।
for level in range(1, 22):
print(level, f"{3 ** level:,}") # শুধু এই ধাপে কতজন লাগবে
গাণিতিকভাবে অসম্ভব। কোনো এক জায়গায় নতুন মানুষ পাওয়া থেমে যাবেই। আর তখন যারা সবার শেষে যোগ দিয়েছেন (যারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি), তারা কাউকে যুক্ত করতে পারবেন না, শুধু টাকা আর পণ্য নিয়ে বসে থাকবেন।
টাকা কোন দিকে যায়

এমএলএম (মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং) এ সাধারণত:
- যোগ দিতে ফি বা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য কিনতে হয়।
- আয়ের বড় অংশ আসে নতুন সদস্য যুক্ত করা থেকে, পণ্য বিক্রি থেকে না।
- ওপরের অল্প কয়েকজন বিপুল আয় করেন, আর তাদের গল্পই বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়।
- নিচের বেশিরভাগ মানুষ সামান্য আয় করেন বা টাকা হারান।
বিভিন্ন দেশের গবেষণা আর নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদন বারবার দেখিয়েছে যে এ ধরনের কাঠামোয় বিপুল সংখ্যক অংশগ্রহণকারী লাভের মুখ দেখেন না। আর যে কাঠামোয় মূল আয় শুধুই নতুন সদস্যের টাকা, সেটা সোজাসুজি পিরামিড স্কিম, যা অনেক দেশেই বেআইনি।
কেন মানুষ তবু যোগ দেয়
- আশা: চাকরির বাজার কঠিন, আর এখানে স্বাধীনতার স্বপ্ন।
- সম্পর্ক: বন্ধু, আত্মীয় বা প্রতিবেশী ডাকছেন, "না" বলা কঠিন।
- সাফল্যের গল্প: গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ, মঞ্চে পুরস্কার। শুধু ওপরের মানুষদের।
- "তুমি চেষ্টা করছ না": ব্যর্থ হলে দোষ দেওয়া হয় ব্যক্তিকে, কাঠামোকে না।
- সম্মোহনী সভা: জোরালো গান, আবেগঘন বক্তৃতা, "সফল" মানুষদের মঞ্চে ডাকা।
কীভাবে চিনবেন
- যোগ দিতে টাকা বা বড় পরিমাণ পণ্য কিনতে হয়?
- নতুন সদস্য আনার ওপর বেশি জোর, পণ্য বিক্রির চেয়ে?
- পণ্যের দাম বাজারের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি?
- "সীমিত সময়", "এখনই না হলে সুযোগ হারাবে" জাতীয় চাপ?
- আয়ের দাবি অবাস্তব, কিন্তু প্রমাণ শুধু কয়েকজনের গল্প?
দুই-তিনটা "হ্যাঁ" হলেই দূরে থাকুন।
বন্ধুকে না বলবেন কীভাবে
ভদ্রভাবে, স্পষ্টভাবে: "তুই আমাকে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু আমি এ ধরনের ব্যবসায় আগ্রহী না।" ব্যাখ্যা বা তর্কে যাওয়ার দরকার নেই। আর সম্ভব হলে বন্ধুকে আলতো করে জিজ্ঞেস করুন, এ পর্যন্ত মোট কত টাকা দিয়েছে আর কত ফেরত পেয়েছে। অনেক সময় এই প্রশ্নটাই চোখ খুলে দেয়।
শেষ কথা
পিরামিডের ছবিতে চূড়াটা সুন্দর দেখায়। কিন্তু পিরামিড টিকে থাকে নিচের অগণিত পাথরের ভারে, আর সেই পাথরগুলো কখনো চূড়ার রোদ দেখে না। আপনার কষ্টের টাকা আর বন্ধুত্ব, দুটোই অনেক বেশি মূল্যবান।