স্টার্টআপ সংস্কৃতি: বাংলাদেশের ইউনিকর্ন স্বপ্ন

গত এক দশকে বাংলাদেশে স্টার্টআপ শব্দটা খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে। রাইড-শেয়ারিং, খাবার ডেলিভারি, মোবাইল ফিনান্স, ই-কমার্স, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রযুক্তি। কিছু কোম্পানি বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে, লাখো মানুষ তাদের সেবা ব্যবহার করছেন। আবার কিছু বড় নাম চোখের সামনে ভেঙেও পড়েছে, বিশেষ করে ই-কমার্সে, যেখানে গ্রাহকের টাকা আটকে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
"ইউনিকর্ন", মানে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নের স্টার্টআপ, এই স্বপ্ন অনেক তরুণের চোখে। স্বপ্ন দেখা ভালো। বাস্তবতাটাও জানা দরকার।
বেশিরভাগ স্টার্টআপ টেকে না

এটা হতাশার কথা না, এটা প্রকৃতি। স্টার্টআপ মানেই অনিশ্চিত কিছু পরীক্ষা করা। বিনিয়োগকারীরাও জানেন বেশিরভাগ বিনিয়োগ ডুববে; কয়েকটা বিশাল সাফল্য বাকিগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে দেয়।
যে ভুলগুলো বারবার দেখা যায়
১. সমস্যা ছাড়া সমাধান। "আমরা একটা অ্যাপ বানাচ্ছি" দিয়ে শুরু, "কার জন্য, কোন সমস্যা?" এর উত্তর পরে খোঁজা।
২. অস্বাভাবিক ছাড়ের ওপর বৃদ্ধি। বিশাল ক্যাশব্যাক আর ছাড় দিয়ে গ্রাহক আনা সহজ। ছাড় বন্ধ হলে গ্রাহক থাকে কি না, সেটাই আসল প্রশ্ন। কিছু ক্ষেত্রে এই মডেল টেকসই না হয়ে প্রতারণার দিকেও গেছে।
৩. ইউনিট ইকোনমিক্স না জানা। একজন গ্রাহক আনতে কত খরচ, আর সে মোট কত আয় এনে দেয়? প্রতিটা অর্ডারে ক্ষতি হলে, বেশি অর্ডার মানে বেশি ক্ষতি।
৪. গ্রাহকের টাকা আর কোম্পানির খরচ মিলিয়ে ফেলা। আগাম নেওয়া গ্রাহকের টাকা দিয়ে অন্য খরচ চালানো, এটা শুধু খারাপ ব্যবসা না, অনেক ক্ষেত্রে আইনি সমস্যা।
৫. প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অস্পষ্টতা। কে কতটুকু মালিক, কে কী সিদ্ধান্ত নেবে, কেউ চলে গেলে কী হবে, শুরুতেই লিখিতভাবে ঠিক না করলে পরে বন্ধুত্ব আর কোম্পানি দুটোই ভাঙে।
বাংলাদেশের সুবিধা
- বিশাল, তরুণ জনগোষ্ঠী আর দ্রুত বাড়তে থাকা স্মার্টফোন ব্যবহার।
- অনেক সমস্যা এখনো অমীমাংসিত: লজিস্টিকস, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার, কৃষকদের বাজার, ক্ষুদ্র ব্যবসার অর্থায়ন, শিক্ষা।
- স্থানীয় জ্ঞান: বিদেশি কোম্পানি যা বোঝে না, যেমন নগদ লেনদেনের সংস্কৃতি, স্থানীয় ভাষা, গ্রামের বাস্তবতা, সেখানে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সুবিধা।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শ
- একটা সত্যিকারের সমস্যা থেকে শুরু করুন, যেটা আপনি নিজে বা কাছের মানুষ ভোগ করেন।
- ছোট করে পরীক্ষা করুন। পুরো অ্যাপ বানানোর আগে একটা ফেসবুক পেজ, একটা গুগল ফর্ম, বা হাতে হাতে সেবা দিয়ে দেখুন মানুষ সত্যিই চায় কি না, আর টাকা দেয় কি না।
- শুরু থেকেই হিসাব রাখুন। প্রতিটা টাকার হিসাব, আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, স্বচ্ছতা।
- গ্রাহকের আস্থা সবচেয়ে বড় সম্পদ। প্রতিশ্রুতি দিন যা রাখতে পারবেন।
- ইউনিকর্ন না, টেকসই ব্যবসার লক্ষ্য রাখুন। লাভজনক, ধীরে বাড়তে থাকা একটা কোম্পানি, যেটা পঞ্চাশজনের চাকরি দেয় আর হাজারো মানুষের সমস্যা সমাধান করে, সেটাও অসাধারণ সাফল্য।
শেষ কথা
স্টার্টআপ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় উপহার হয়তো মূল্যায়নের সংখ্যা না; এটা একটা মানসিকতা: সমস্যা দেখলে অভিযোগ না করে সমাধানের চেষ্টা করা। বাংলাদেশ থেকে ইউনিকর্ন আসবে কি না, সময় বলবে। কিন্তু সৎ, টেকসই, মানুষের কাজে লাগা কোম্পানি যত বেশি হবে, দেশের অর্থনীতি আর তরুণদের আস্থা তত শক্তিশালী হবে।